– " স্বপ্না, ও স্বপ্না। মা স্বপ্না। দেখে যাও মা ঐ আমার সবুজ আসছে।"
আরিফা জামানের ডাক শুনে স্বপ্না এসে শ্বাশুড়ির পশে দাড়ায়। তার শূন্য দৃষ্টি মেলে দেয় নদির বাকপথ পর্যন্ত। নিরবে দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে বলে,
– "না আম্মা। আপনি ভুল দেখছেন। আপনার চশমাটা আর না কিনলেই নয়। এখন
উঠুনতো রোদ গড়িয়ে গেল। গোসল সেরে কিছু মুখে দেবেন "। উঠতে চান না আরিফা।
পথ চাওয়াই তার স্বস্তি, এই পথই তার সুখ। চোখের উপর বাম হাতটা রেখে রোদের আচ আড়াল করে বলেন,
– " কই বেলা গড়িয়েছে? সূর্যটা এখনো মাথার উপরে গড়ায়নি। তুমি যাও মা! আমি আরেকটু বসি " ।
স্বপ্না আর কোন কথা না বাড়িয়ে চলে যায়। ষাটোর্ধ স্বপ্না থেকে এভাবেই দেখে আসছে আরিফা জামানকে। আরিফা জামান ফজরের নামাজ পড়ে বারান্দায় বসে দৃস্টি যতদুর যায় ততদুর পর্যন্ত থাকিয়ে থাকেন ছেলে ফেরার প্রত্যাশায়। এভাবেই কাটছে দিন মাস, বছর। এক যুগ, দই যুগ, তিন যুগ পেরিয়ে চার যুগ হতে চলেছে। তবুও শেষ হয়না আরিফা জামানের পথ চাওয়া, ফুরায়না ছেলে ফিরার প্রতিক্ষার প্রহর গুনা।স্বপ্না চলে গেলে, আরিফা জামান দুহাত দিয়ে চোখ মুছেন আর ভাবেন খোকার কথা।
স্বামী হারা আরিফার একমাত্র সন্তান ছিল সবুজ। পড়াশোনা শেষ করে সদ্য চাকুরি পেয়েছে তার আদরের দুলাল।ছেলে শহর থেকে বাড়ি আসে। মাকে নিয়ে যাবে শহরে। বাসা বাড়ি সব ঠিকঠাক।কিন্তু মা বেকে বসেন “না, তোর সাথে আমি একা যাবনা। স্বপ্নাকে ও নিয়ে যেতে চাই ” মায়ের মুখে স্বপ্নার নাম শুনে সবুজের মুখখানা লজ্জায় লাল হয়ে যায়। তা এড়ায় না মায়ের চোখ। আরিফা জামান ভাবেন, তার ছেলে কোনদিনও তার কথার অবাধ্য হয়নি। তবুও সেদিন বেকে বসেছিল, বলেছিল “মা, এত তাড়াহুড়ো কিসের, নতুন চাকরি একটু গুছিয়ে নেই। তাছাড়া দেশের অবস্থাও ভালো না। চারিদিকেগন্ডগোল হচ্ছে ..."
মা ছেলেকে থামিয়ে দেন, আর বলেন “কিসের গন্ডগোল? আমরা নির্বাচনে জিতেছি,আজ হোক কাল হোক ক্ষমতা আমাদের কাছে দিতেই হবে, এটা নিয়ে এতটা উদ্বেলিত হওয়ার কিছু নেই। এ নিয়ে ভাবভার অনেক আছে। তোকে এসব নিয়ে না ভাবলেও চলবে। আমি চাই ঘরে লালটুকটকে একটি বৌমা আর বংশের প্রদীপ। ”
অগ্যতা নিরুপায় হয়েই সবুজকে বিয়ের পিড়িতে বসতে হল মায়ের পছন্দ করা পাত্রী স্কুলের হ্যাডস্যারের মেয়ে স্বপ্নার সাথে। ধুমধাম করে বিয়ে হল, আমন্ত্রণ করা হল দুগ্রামের লোকজনকে। বিয়ে করা বৌ আর মাকে নিয়ে সপ্তাহখানেক পরেই সবুজ চলে এলো শহরে।
এদিকে যতই দিন যাচ্ছে ততই দেশের পরিবেশ উত্তপ্ত হতে থাকলো। রাস্তায় রাস্তায় মিটং মিছিল, আর অধিকার অদায়ের দাবি। এভাবেই কেটে গেল কিছু দিন।
হঠাৎ করেই ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকা শহরে হামলা চালাল পাকবাহিনী, শেখ মুজিবকে
করা হল গ্রেফতার, নারকিয় হত্যাযঙ্গ চালানো হলো শহরের অলিতে গলিতে।
বৃদ্ধ,যুবক -শিশু কেউ রেহাই পেলনা তাদের হাত থেকে।সেই কালো রাত ঘরের বাতি নিভিয়ে খাটের নিছে শুয়ে কাঠিয়েছিলেন গর্ভবতী পুত্রবধুকে নিয়ে। সেই রাতের কথা মনে হলে এখনো শিউরে উঠেন তিনি। পরদিন পায়ে হেটেই গ্রামে ফিরেছিলেন ছেলে ও অনাগত বংশের প্রদিপ পেটে ধারনকারিনী পুত্রবধুকে নিয়ে। সেদিনের হাজারো কষ্ট তিনি ভুলে গিয়েছিলেন নতুন দেশের,নতুন মানচিত্রের স্বাধিন একটি পতাকার স্বপ্ন দেখে।গ্রামে ফিরেই সবুজ চলে যায় মুক্তি বাহিনিতে ।
ছেলের পথ প্রচন্ডভাবে আগলে ধরেছিলেন সেদিন ,কিছুতেই ছাড়বেননা। সেদিন তিনি হার মেনেছিলেন ছেলের যুক্তির কাছে ” তোমাকে কেউ অপমান করলে কি আমি চুপ করে থাকতে পারব মা? তোমার অপমান সইলে কি তোমার গর্বের অপমান হবেনা মা? বল মা, নিজের দেশে স্বাধীীনভাবে চলাফেরা করার দাবি কি অন্যায়? বল মা ,এই দেশটা আর তুমি কি এক নও? "
সেদিন তিনি কোন জবাব দিতে পারেননি, আবেগে তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এসেছিল। সেই অশ্রু মুছে দিয়ে সবুজ বলেছিল “মা এখন তো তুমি একা নও,স্বপ্না আছে। তোমার বংশের প্রদিপ আসছে। আর কয়টা দিন মা,অামি ফিরে আসব নতুন পতাকা নিয়ে। স্বাধীনভাবে চলব, মুক্তবাতাসে মা তোমার বংশের প্রদিপ হাসবে,খেলবে। প্রণভরে মা তুমি, আমি,স্বপ্না নিশ্বাস নেব স্বাধীনতার। ”এই বলে ছেলে বিদায় নিয়ে চরে যায় মুক্তিযুদ্ধে।
হঠাৎ একদিন ছোট্র এই শান্তিনগর গ্রামে হামলা পাকবাহিনী ও তার দোসররা।জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় ঘরবাড়ি। স্বপ্নার বাবাকে গুলি করে বুক এপোড় ওপোড় করে দেয়।ধরে নিয়ে যায় গ্রামের অবলা কিশোরি,যুবতি গৃহবধুদের। রক্ষা পায়নি স্বপ্নাও । তার বাবাকে গুলি করে হত্যার পর স্বপ্নার ৯বছর বয়সি বোনসহ ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায় তাকে।একেক করে কেটে যায় দিন সপ্তাহ মাস। দেশ স্বাধীন হয়। স্বপ্নাকে স্কুলের ক্যাম্প থেকে অর্ধউলঙ্গ অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হলেও তার বোনের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আরিফা জামান আজ অনেকদিন পর টিভি সেটের সামনে বসেছেন। চোখে তেমনটা না
দেখতে পেলেও কানে শুনেন স্পষ্ট। তিনি টিভির সাউন্ডে শুনছেন স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও আজ বাকস্বাধীনতা নেই, চলাফেরার স্বাধীনতা নেই। চলতে ফিরতে বাসে –ট্রেনে পেট্রোল বোমা আর হাত বোমার আতন্ক। হসপিটালে আগুনে ঝলসানো মানুষের আর্তচিৎকার, রাতের আধারে ক্রসফায়ারের লোমহর্ষক দৃশ্য, গুম আর নির্যাতনের শিকার তার মমতাময়ী মায়েদের কান্নার শব্দ তিনি শুনছেন আর ভাবছেন” সেদিন কাধে বন্দুক ঝুলিয়ে কালাম,রফিক শাকিল ,মন্টুরা ফিরে আসলেও তার খোকা এখনো ফিরেনি। সে হয়তো ফিরে আসবে এসকল মায়েদের চুখের অশ্রু মুছে দিতে , সে হয়তো ফিরে আসবে আরেকটি শান্তির যুদ্ধ সমাপ্ত করেই ।তিনিও এখনো পথ চেয়ে আছেন, তার খোকা ফিরে আসবে স্বাধীীনতা নিয়ে, যেখানে প্রাণভরে ,মনখোলে স্বাধীনতার ঘ্রাণ নিবে তার অনাগত বংশের প্রদীপরা।
”
সেই স্বপ্নে পথ চেয়ে আছেন আরিফা জামান, অপেক্ষা করছেন স্বাধীন পতাকা
নিয়ে খোকা তার বুকে ফেরার।
প্রকাশিত : সিলেটের খবর ১৩ মার্চ ২০১৫
পড়তে এখানে ক্লিক করুন

No comments:
Post a Comment