Monday, November 28, 2016

অপেক্ষার প্রহর



রাত প্রায় দুটো। রাহাত দু'পা সোজা করে হাত দু খানা মাথার উপর দিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। আজ যেন তার চোখে ঘুম নেই। শ্যেন দৃষ্টিতে এক পলক তাকিয়ে আছে মাথার উপরে ঘরের ছাদের দিকে। ঠিক তার মাথার উপরে ৭৫ বল্টের একটি বাতি জ্বলছে। আর তার দু পাশে দুই জন, না তার চার পাশে প্রায় ৭০/৮০ জন লোক শুয়ে আছে। কেউ ঘুমুচ্ছে, কেউবা ঘুমোনোর খসরত করছে আবার কেউবা তার মতই নির্ঘুম। তবে কে ঘুমুচ্ছে আর কেইবা জেগে তার খোজ নেওয়ার যেমন কোন সুযোগ নেই ঠিক তেমনি কার মনে কত সুখ ( যদিও সুখ বলতে এখানে কিছুই নেই) আর কার কোন দুঃখের নদী বয়ে যাচ্ছে তারও খবর নেওয়ার কোন মাথা ব্যাথা, আগ্রহ কারো নেই।।

রাহাত সেই সন্ধ্যা থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছে ঘুমোনোর। কিন্তু তার চোর চোখ যেন ঘুমকে ছুটি দিয়েছে, তার আপন মনে কোথায় বেড়াচ্ছে, কার সাথে লুকোচুরি খেলছে রাহাত তার নাগাল পাচ্ছে না।সে আজ আজ এক অধরা প্রজাপতি। যতই তাকে ধরতে চাচ্ছে ততই তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
রাতের খাবার খাওয়ার পর থেকে তার মন ভালো নেই। প্রিয়তমার মায়াবি মুখ তার চোখে বারেবার ভেসে উঠছে। লজ্জা মেশানো সেই হাসি আজ দেখা হয়নি কত দিন। আঙুল কষ সে হিসাব মিলায়। এক, দুই তিন দিন .....। এক মাস, দুই মাস, তিন মাস ...।এভাবে এক বছর পেরিয়ে প্রায় দুই বছর হতে চলল....। আজ বড্ড মনে পড়ছে তারে। ইচ্ছে করছে আজকের এই জোৎস্না রাঙা রাত প্রিয়তমার হাতে হাত রেখে কাটিয়ে দেয়, কত শত গল্প করে, সুখ - দুখের হিসাব কষে কাটিয়ে দেয়....। নাহ! সে আর ভাবতে পারছেনা বুকের মধ্যে চিন চিনে এক ব্যাথা অনুভব করছে। বালিশের উপর মাথা রেখে একবার এপাশ ওপাশ দেখে নিল। প্রায় সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আস্তে করে শোয়া থেকে উঠে বসল, দেয়ালে টাঙানো ব্যাগটির দিকে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিল সমগ্র ঘরের একোণ থেকে সে কোণ পর্যন্ত।  মনে হয়না কেউই  জেগে আছে। সে আস্তে আস্তে উঠে দাড়াল। দেয়ালে টাঙানো ব্যাগ থেকে লুকিয়ে রাখা প্রিয়তমা রুহিনার ছবিখানা করে নিয়ে এসে আবার নিজ জায়গায় শুয়ে পড়ল। মাথার উপরে যে বাতিটি জ্বল জ্বল করছে সেই বাতিটিকে আজ প্রায় দুমাস অবধি সে নিভতে দেখেনি (লোডশেডিং ছাড়া)  ।তার মনে হল সেই বাতিটিরও বোধ হয় রাহাতের মতো অনেক কিছু বলার আছে। তাই রাতের এই নিস্তবদ্ধতায় তাকে বন্ধু বানাতে কোন দোষ নেই। সেই বাতির আরোয় রাহাত তার চোখের সামনে মেলে ধরল প্রিয়ার হাসিমাখা মুখের একটি ছবি। সেই ছবির মায়াবী কাজল কালো দুটি চোখ যেন অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে রাহাতের দিকে। রাহাতের মনে হচ্ছে অনেক অভিমান জমা রয়েছে সেই দুটি চোখে। রুহিনা বলতে চাইছে অনেক কিছুই।রাহাতও অধীর হয়ে আছে সেই অভিমানে ভরা কথাগুলো শুনার। হুম! হয়তো চোখে চোখে তাদের অনেক কথা হয়ে গেল। রাহাত ভাবছে রুহিনাও হয়তো তারই মতো রাত জেগে আছে, প্রিয়তম স্বামীর আগমনের অপেক্ষায় এক এক করে প্রহর গুনছে। মনে মনে হয়তো প্রতিজ্ঞা করছে রাহাতের সাথে আর কথাই বলবে না আবার ক্ষণে সেই প্রতিজ্ঞা ভাংছে, চোখের পানিতে বালইশ ভিজাচ্ছে। আর না বলা কথা জমিয়ে রাখছে রাতের পর রাত। ভাবতে ভাবতে রাহাতের চোখে যেন মেঘ জমে উঠল, ছলছল করছে, এই বুঝি বৃষ্টি বর্ষণ হবে।
রাহাত হোসেন। বয়স ৩২। টগবগে এক তরুণ। যে স্বপ্ন দেখেছিল একটি সুখী সংসারের। সুখের আল্পনা আর রংতুলিতে ক্যানভাসে একেছিল এক স্বপ্নময় পৃথিবী। সেই পৃথিবীকেই সাঝাতেই রুহিনার সাথে আংটি বদল হয় পারিবারিক সিদ্ধান্ত আর মায়ের চাপে। যদিও রাহাত বারণ করছিল এই সময়ে বিয়ের সাঝে নিজেকে সাঝাতে। কিন্তু অভিমানী মায়ের মুখের দিকে চেয়ে তার সেই বারণ করার শক্তি আর ছিল না । যথা সময়ে আংটি বদল ও আকদ্ সম্পন্ন হয়। অপেক্ষার প্রহর ঘুনছিল বিয়ের দিনের, সানাি বাজানোর, মেহেদি হাতে পরার আর লাল টুকটুকে শাড়িতে রুহিনাকে আপন করে নেওয়ার।
না। রাহাতের মেহেদি পরা হয়নি, মাথায় পাগড়ি, শেরওয়ানি পরে বিয়ের সাঝেও সাঝা হয়নি, রুহিনাকে লাল শাড়িতে দেখার পরম সুখের মুহূর্তও আজ অবধি হয়নি। আজ সে ১০ হাত প্রস্থ আর ৫০ হাত দৈর্ঘ বিশিষ্ট একট হলরুমের বাসিন্দা প্রায় দু বছর যাবৎ।যেখানে তার সমবয়সি থেকে শুরু করে তার থেকে বড় -ছোট মিলিয়ে আরো শ'খানেক মানুষের বসবাস।বিয়ের ঠিক দু দিন আগে রঙিন সাঝে তার আপন ঠিকানা সাঝছিল , নতুন কনেকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল বাড়িময়। এমন সময় দুই গাড়ি পুলিশ -র্যাব তার বাড়ি ঘেরাও করল। যে হাতে এক দিন পর মেহেদি পরার কথা ছিল সেই হাতে শক্ত হাত কড়া পরিয়ে নিয়ে তাকে নিয়ে আসা হল এই বিশাল হলরুমে।
কারন রাহাত অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কন্ঠর নাম, স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধ এক প্রতিবাদি মুর্ত প্রতিক। রাহাত হোসেন,  ইসলামী আন্দোলনের একজন নিবেদিত প্রাণ, জুলুমশাহীর জুলুমের প্রতিবাদে মুখর এক যুবকের নাম ।অন্যায়ের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা প্রতিবাদী এক নেতার নাম। তাই আজ সে কারাগারে প্রিয়তমার , আর প্রিয়তমা রুহিনা পিত্রালয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণছে প্রিয়তম স্বামীর আগমনের, মুক্তির ........
০৫/১১/১৬

No comments:

Post a Comment